উপদেষ্টা সম্পাদক

সম্পাদক

নির্বাহী সম্পাদক

সহযোগী সম্পাদক

সম্পাদনা সহযোগী

আলোকচিত্রী

প্রতিবেদক

প্রতিনিধি

সাবিহা সুলতানা কর্তৃক প্রকাশিত

যোগাযোগ : imranbtv1@gmail.com

Edit Template

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতি

লোকজ অস্তিত্বের সকল জীবনাচারণই হচ্ছে লোকসংস্কৃতি। লোকজ সত্ত্বায় মিশে আছে বাঙালির নৃ-তাত্বিক ঐতিহ্য। আবহমান কাল ধরে  লোকসংস্কৃতির বহুবিধ শাখা-প্রশাখার মতো বাঙালির উৎসবের মধ্যে ছড়িয়ে আছে আমাদের স্বকীয়তা। দেশের আনাচে-আনাচে, হাজারো মাইলের পল্লীর কোল জুড়ে লালিত হয়ে আসছে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি-উৎসব। বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ, বাংলার বারোমাসের নানা আচার-অনুষ্ঠানাদি আমাদের লৌকিক সংস্কৃতি এখন লৌকিক আচার হয়ে আছে। যা জীবনের অংশ এখন। 

বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি, উপলক্ষ পেলেই উৎসব জাকিয়ে বসে, সে হোক ঘরে, হোক বাইরে অথবা বনে-বাদারে। তবে অনাদিকাল থেকে বাঙালির মন দোলায় আর প্রাণে নাচন লাগে বৈশাখে। কারণ, বাঙালির সুদীর্ঘ কালের সাংস্কৃতিক বন্ধন বৈশাখের সঙ্গে। আকবর বাদশার হাত ধরে ফসলী আর চন্দ্র সূর্যের বাও দিয়ে প্রচলিত সাল, এদেশের এক শাসক খোড়া করে দিলেন। তাও তার মহাত্ম কমেনি একটুও। ১৯৬৮ সাল  থেকে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ বরণের মধ্য দিয়ে এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে বাংলা নতুন বছর পালনের রীতিতে। সারা বাংলায় হালখাতায় নতুন বছর পালনের রীতি তৃনকাল থেকেই প্রচলিত ছিলো। একথা বলা যায় বাঙালি সংস্কৃতি মূলত লোক সংষ্কৃতি। 

কারন লোকসমাজের জীবনাচরণ ও ভূয়োদর্শনের প্রতিফলন আছে লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার আর লোকাচারে। পালা-পার্বণ-বিবাহ-ক্রীড়া-মেলা-নবান্নে মূর্ত হয়ে ওঠে উৎসব-আনন্দের লোক রূপ। প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গে আসে পোশাক-পরিচ্ছদ-সজ্জা-প্রসাধন ও খাদ্য-খাবারের খাদ্যের কথা। বাংলার লোকসংস্কৃতি বঙ্গ জনপদবাসীর যৌথ জীবনচর্চার এক আন্তরিক ভাষ্য। সমন্বয়, সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের এক অপূর্ব নিদর্শনের সাক্ষ্য বহন করে বাংলার এই লোকসংস্কৃতি। ইতিহাসের সূচনালগ্নের বঙ্গ জনপদের আদিম অধিবাসীদের বিশ্বাস-সংস্কার ও লোকাচারকে কেন্দ্র করেই এই লোকসংস্কৃতির জন্ম। নানা জনগোষ্ঠীর রক্তের মিশ্রণে যেমন বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে, তেমনি তার সংস্কৃতি সম্পর্কেও এ কথা সত্য। সুদূর অতীতের স্মৃতিচিহ্নবাহী বাংলার লোকসংস্কৃতি তাই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’র ধারণাটি সার্থক করে তুলেছে।

বাংলার লোকসংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় আনন্দ-রূপের সন্ধান, প্রবল জীবনাগ্রহ, প্রতিবাদী চেতনা, জাত-ধর্ম-গোত্র-বর্ণনির্বিশেষ মানুষের কথা, মানবিকতা ও জাগতিকতার পরিচয়। লৌকিক সমাজের মানুষ তাদের জীবনাচরণে সত্য বলে মেনেছে। আমরা বাংলার লোকসংস্কৃতির সাধারণ রূপের প্রেক্ষাপটে তার সমাজসংলগ্ন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, যার সূত্রে আধুনিক কালে লোকসংস্কৃতির তাৎপর্য ও গুরুত্বের পাশাপাশি তার প্রগতিশীল উপকরণ আবিষ্কৃত হয়ে বর্তমান প্রজন্মকে প্রাণিত ও শ্রদ্ধাবান করে তুলতে পারে।

লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সুদূর অতীতের টোটেম, ট্যাবু ও জাদুবিদ্যার সম্পর্ক অতি নিবিড়। সংকট-শঙ্কা-অমঙ্গল দূরীকরণের পন্থা-পদ্ধতির সঙ্গে লোকবিশ্বাস ও সংস্কারের যোগ গভীর। ব্রত-মানত-বশীকরণ-জাদুমন্ত্র-ঝাড়ফুঁক-টোটকা-তাবিজ ইত্যাদির মাধ্যমে ইচ্ছাপূরণ ও মুশকিল আসানের চেষ্টা চলে। 

তাজিয়া-পরমব্রত কিংবা রথ, পির-দরবেশের দরগায় মানতএসব ক্ষেত্রেউৎসবে সকল জাত-পাত বিলীন হয়ে যায়। মুসলমান কৃষকের মনসাতুষ্টির আরধনা কিংবা হিন্দু মাঝির ‘বদর বদর’ বলে দরিয়ায় যাত্রা শুরু এসবই লোকসংস্কারের রীতি, যা প্রজন্মপরম্পরায় প্রচলিত। বৃষ্টি কামনায় যেমন  কোনো পল্লিবাসী কৃষিনির্ভর হিন্দু ‘আল্লাহ ম্যাঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই’ গান গাইতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, তেমনি হিন্দু দেবদেবীর নাম নিয়ে সাপের মন্ত্র উচ্চারণে মুসলমান ওঝার কোনো দ্বিধা নেই। আসর-বন্দনায় ভক্তি-নিবেদনে আল্লাহ-ভগবান, রসুল-দেবতা সম-পা্ংেক্তয়, এক নিশ্বাসে উচ্চারিত।

তবে কিছু লোকাচারে সম্প্রদায়নির্বিশেষে অভিন্নতার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু, কৃষিকর্ম কাজে। বন্ধ্যা নারীর সন্তান কামনা, গর্ভবতী রমণীর ‘সাধভক্ষণ’, সন্তান জন্মের পর অনিষ্ট-ভঞ্জন-সতর্কতা ও বিবাহের কিছু আচার লোকসমাজে ধর্মভেদে অভিন্ন। কৃষিসম্পর্কিত লোকাচারেও সাদৃশ্য আছে। বৃষ্টি কামনা, হল-কর্ষণ, বীজ বপন, ফসল রক্ষা, ফসল তোলার ক্ষেত্রে যে লোকাচার পালিত হয়, তাতে কৃষিজীবী সমাজের ঐক্য-একাত্মতার আন্তরিক চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলার লোকজীবনে আবাস-আসবাব-খাদ্য-পরিধেয়-প্রসাধন-অলংকার-তৈজসপত্রও মূলত এক। খড় বা শণের দোচালা ঘর, পাটকাঠি বা কঞ্চির বেড়া, এক পাশে গোয়ালঘর, একচিলতে উঠোন, চারপাশে গাছগাছালিগ্রামীণ মানুষের বাস্তুগৃহের সাধারণ ছবি। মাদুর-কাঁথা, বাঁশের মাচা কিংবা মাটির মেঝেশয়নের উপকরণ ও ব্যবস্থা। তৈজসপত্রের মধ্যে মাটির হাঁড়ি-পাতিল-সানকি-কুঁজো, কাঁসার থালা-বাটি-ঘটি-ঘড়া। কেবল স্ব স্ব সম্প্রদায়ের শাস্ত্রনিষিদ্ধ। এছারা বাঙালি সমাজের খাদ্যাভ্যাসও প্রায় অভিন্ন। লোকায়ত বাঙালির পোশাক-পরিচ্ছদও একই ধরনেরধুতি, লুঙ্গি, চাদর, গামছা, ফতুয়া। তবে আদি বাঙালি সমাজের লোক পরিধেয় আরো কয়েক ধাপ সরেস ছিলো। পুরুষদেরপরনে নেংটি অথবা ধুতি আর উর্ধাঙ্গ খালি, মোটা সুতোর তাঁতের শাড়ি গ্রাম্য রমণীর সর্বজনীন আটপৌরে পোশাক।  কোথাও হিন্দু সধবার মতো বিবাহিত মুসলিম রমণীর শাখা-সিঁদুর ব্যবহারেরও চল ছিলো। 

ছড়া-ধাঁধা-প্রবাদ-মন্ত্র-কিংবদন্তি-লোকশ্রুতি-লোককথা-লোককাহিনি-গীতিকা ও গীতির এক বিপুল ঐশ্বর্যভান্ডার নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলার লোকসাহিত্য। জাত-পাতের উর্ধ্বে উঠে সাহিত্য চর্চা করেছে ভাবজগতের পরিভ্রাজকরা। 

‘সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন।

লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান॥’

বাঁশ-বেতের কাজ, মাটির তৈরি হাঁড়ি পাতিল, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, কাঁথার কারুকাজ, দাঁড়িয়াবান্দা, ছি, বৌছি, কানামাছি, ডাংগুলি খেলা, বলি খেলা, লাঠিবাড়ি খেলা, ঘুড়ি উড়ানো, মেলা, তীর্থ ভ্রমণ, আত্মীয়বাড়িতে বেড়ানো, যৌথ পরিবার, বড়দের মান্য করা ছোটদের স্নেহ করা, সন্তান জন্মদানে আঁতুরঘর, পাটের, শনের, ধানের, চালের বহুমুখী ব্যবহার, নৌকা বাইছ, ঘোড়া দৌড়ানো, মইদৌড়, লাঙ্গলদৌড়, কেশকামলা, বিলের মাছ ধরতে হাত বাওয়া,  কোনো পাখির ডাককে কল্যাণ-অকল্যাণ জ্ঞান করা, ইত্যাদি বহুমুখী ধারায় লাকসংস্কৃতির বিচরণ আমদের গ্রামীন সমাজে। এর কোনো কোনটা অধূনা সংস্কার না হয়ে কুসংস্কার হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কু-হোক আর সু- হোক এসবই লোকসংস্কৃতির উপাদান। 

নতুনের আহ্বান নিয়ে আসে বৈশাখ। আমাদের আর্থ-সামাজিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও নীতি-নৈতিকতার ইতিহাসের পাতায় তাই দেখতে পাই পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। ফলে বাংলা সনের প্রথম দিনটি তথা পহেলা বৈশাখকে আলাদা বৈচিত্র্যে পালন করাও এখানকার লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম অঙ্গ।

পহেলা বৈশাখ পালনে যেসব উপাচার পালন করা হয় এর মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা একটি। কৃষক পরিবারের মেয়েরা ঘরের মাটির পিরা এবং দুয়ার লেপে-পোচে সুন্দর করে। হিন্দু পরিবারে কাদামাটির সাথে গোবর মিশিয়ে লেপা-পোচা করা হয়। মুসলমান পরিবারে  ভোরে ঘুম থেকে ওঠে প্রাতরাস ও প্রর্থনা সম্পন্ন কওে কৃষক তার কৃষির সরঞ্জাম লাঙ্গল-জোঁয়াল-মই এর পরিচ্ছন্নতা কর্ম শেষ করে গরুকে ভালো খাবার দেয়।  

এমন নানান ভালোর সঙ্গে আমাদের শৈশবের বছরের পহেলা দিন শুরু হতো। 

খুব সকালে ঘুম থেকে জাগিয়ে মা বাড়ির সামনে খালে নতুন পানিতে গোসল করাতেন। শরীরে তেল মেখে, নতুন কাপড় পরিধান করাতেন। মায়ের হাতে রান্না করা পায়েস খেয়ে গ্রাম ঘুরতে যেতাম আমরা। মা বলতেন আজকে মাস পয়লা, কারো সঙ্গে মিথ্যা বলবে না। ঝগড়া করবে না। দুপুরে বাসায় এসে পোলাউ খাবে। বাজুনিয়া বাড়ি থেকে আনা পটাশ হাতে গ্রাম ঘুরতে বের হতাম। যাদের বাড়িতে ছনছা তলায় ইট আছে, সেখানে গিয়ে পটাশ ফোটাতাম। 

এখন সময় ভিন্ন ছেলে-বুড়ো সকলেই ডিভাসে বুদ। ঘুুড় যত দূরেই যাক সুতা যেমন নাটাইয়ে বাধা। মানুষও প্রকৃতির নিয়মে তার মাটির সঙ্গে বাধা। শিকড়ে ফিরতেই হবে। সেটা আজ হলে ক্ষতি কি!

Share Article:

উপসম্পাদকীয়

Writer & Blogger

Considered an invitation do introduced sufficient understood instrument it. Of decisively friendship in as collecting at. No affixed be husband ye females brother garrets proceed. Least child who seven happy yet balls young. Discovery sweetness principle discourse shameless bed one excellent. Sentiments of surrounded friendship dispatched connection is he. Me or produce besides hastily up as pleased. 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সাম্প্রতিক পোস্ট

  • All Post
  • আর্কাইভ
  • উপসম্পাদকীয়
  • কালের কথা
  • গ্রন্থালোচনা
  • ঝিরি-কাব্য
  • পুনর্মুদ্রণ
  • প্রত্নতাত্ত্বিক
  • প্রবন্ধ
  • রূপকথা
  • স্মরণ

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

০১৯১১-৭৫২২৮৮

আমাদের পরিবারের অংশ হোন!

নিউজলেটারের জন্য সাইন আপ করুন।

আপনাকে সফলভাবে সাবস্ক্রাইব করা হয়েছে! ওহ! কিছু একটা ভুল হয়েছে, অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন।
Edit Template

আমাদের সম্পর্কে

Appetite no humoured returned informed. Possession so comparison inquietude he he conviction no decisively.

সাম্প্রতিক পোস্ট

  • All Post
  • আর্কাইভ
  • উপসম্পাদকীয়
  • কালের কথা
  • গ্রন্থালোচনা
  • ঝিরি-কাব্য
  • পুনর্মুদ্রণ
  • প্রত্নতাত্ত্বিক
  • প্রবন্ধ
  • রূপকথা
  • স্মরণ

আমাদের ফলো করুন

© 2025 Created with Royal Elementor Addons

Scroll to Top