প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মৃৎপাত্র নির্মাণ কৌশল বোঝার চেষ্টা করা বিশেষভাবে জরুরি। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে বা খননে যখন প্রচুর সংখ্যায় মৃৎপাত্র পাওয়া যায়, সেগুলোর একটা বড় অংশ অনেক সময়ই ভাঙা থাকে। আস্ত মৃৎপাত্র পাওয়ার নজিরও দুনিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থানেই আছে। যে মৃৎপাত্র বা মৃৎপাত্রের টুকরোগুলো প্রত্নতাত্ত্বিকগণ খুঁজে পান এবং যত্ন করে সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন, সেগুলোর মাধ্যমে অতীতে মানুষের জীবনযাপন বোঝার চেষ্টা করেন। এই বোঝার কাজটা বিভিন্ন ধাপ বা পর্যায় অতিক্রম করে করতে হয়। সেই আলোচনায় আমি যাব না।
মৃৎপাত্র বা মৃৎপাত্রের টুকরো নিয়ে গবেষণা করার উদ্দেশ্যও অনেকগুলো। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ মৃৎপাত্রের মাধ্যমে মানুষের অতীত জীবনযাপন, কৃৎকৌশল, খাদ্যাভ্যাস, বেঁচে থাকার জন্য অবশ্য করণীয় কাজগুলো করার ধরন, খাদ্য উৎপাদনের ধরন, ধর্মীয় আচরণের বিভিন্নতা, পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের জীবনযাপনের ধরন ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন ইত্যাদি নানাধরনের তথ্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। এই ছোট লেখাটিতে আমি বাংলা অঞ্চলের মৃৎপাত্র নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
মৃৎপাত্র তৈরি করতে সারা দুনিয়ায়ই কয়েকটি দ্রব্য প্রয়োজন হয়। মাটি ছাড়া মৃৎপাত্র তৈরি করা যায় না, সেটা সবাই বুঝবেন। তাহলে মৃৎপাত্র নির্মাণের প্রথম ধাপ হলো মাটি খুঁজে বের করা ও সংগ্রহ করা। মাটির মধ্যে প্রধানত বালি, পলি ও কাদা থাকে। কখনো কখনো নুড়ি পাথরও থাকে। এই উপাদানগুলোকে আমরা পলল বলে থাকি। মাটির মধ্যে বালি, পলি ও কাদার পরিমাণগত হেরফের থাকে অঞ্চলভেদে। কোন ধরনের পলল কী পরিমাণে/অনুপাতে মাটিতে আছে, তার ওপর মাটির বৈশিষ্ট্য, যেমন স্থিতিস্থাপকতা, প্রবেশ্যতা ইত্যাদি নির্ভর করে। কাদা যে মাটিতে বেশি থাকবে, তার স্থিতিস্থাপকতা সবচেয়ে বেশি আর প্রবেশ্যতা সবচেয়ে কম। আবার বালি যে মাটিতে বেশি, সেই মাটির প্রবেশ্যতা সবচেয়ে বেশি কিন্তু স্থিতিস্থাপকতা সবচেয়ে কম। মৃৎপাত্র তৈরি করার জন্য প্রথম এবং প্রধান প্রয়োজন অধিক পরিমাণ কাদাযুক্ত মাটি। কারণ ইচ্ছেমতো ওই মাটিকে আকার দেওয়া যায়। কিন্তু কেবল কাদাযুক্ত মাটি দিয়ে মৃৎপাত্র তৈরি করা যায় না। কারণ সেই মাটি দিয়ে প্রয়োজনমতো আকার দেওয়া হয়তো যাবে, কিন্তু সেই আকার দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব পাবে না। তাহলে কাদাযুক্ত মাটির সঙ্গে এমন কিছু উপাদান মেশাতে হবে, যাতে করে মাটির স্থিতিস্থাপকতা একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। যে উপাদানটি মেশানো হয়, সেটিকে ইংরেজিতে টেম্পার বলে। অঞ্চলভেদে এই টেম্পার আলাদা হয়। কোথাও বালি, কোথাও গোবর, কোথাও তুষ বা পাটের কুচি টেম্পার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাটি ও টেম্পারের অনুপাতও নির্ভর করে কোন ধরনের ও আকারের পাত্র তৈরি করা হবে, কোন ধরনের উপাদান সহজলভ্য এবং কোন ধরনের মাটির সঙ্গে ওই উপাদান মেশানো হবে তার ওপর। বাংলাদেশের বহু জায়গা আছে, যেখানে কাদাযুক্ত মাটি খুবই দুর্লভ। সেক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের মৃৎপাত্র তৈরির মাটিতে বেশি করে বালি বা অন্য কোনো টেম্পার মেশানো হয়। এই মাটি কোনো জায়গা থেকে সংগ্রহ করে এনে সরাসরি মৃৎপাত্র তৈরি করা হয় তা কিন্তু না। মাটিকে মৃৎপাত্র বানানোর উপযোগী করে তুলতে হয়। মাটি ও আনুষঙ্গিক উপাদান সংগ্রহ করার পরের ধাপ হলো মাটিকে মৃৎপাত্র নির্মাণের উপযোগী করে তোলা। মাটি থেকে বিভিন্ন জিনিস (যেমন: নুড়ি, ঘাস বা অন্যান্য উদ্ভিদ ইত্যাদি) আলাদা করে প্রয়োজনমতো জল ও টেম্পার দিয়ে মৃৎপাত্র তৈরি করার মাটি প্রস্তুত করা হয়। হাত দিয়ে বা পা দিয়ে ছেনে মণ্ড তৈরি করে মৃৎপাত্র নির্মাণের এই ধাপ সম্পন্ন হয়।
পরের ধাপে মৃৎপাত্রের আকার দেওয়া হয়। এই ধাপের কৌশলগুলো নির্ভর করে কোন ধরনের মৃৎপাত্র তৈরি করা হবে তার ওপর। মোটামুটিভাবে কৌশলগুলো হলো: এক. চাকায় ঘোরানো; দুই. হাত দিয়ে টিপে ও ছেনে আকার দেওয়া; তিন. ছাঁচে ফেলে আকার দেওয়া; চার. চাকে আংশিকভাবে তৈরি করে অন্য অংশের সঙ্গে পিটিয়ে জোড়া লাগানো; পাঁচ. মাটির সরু টুকরা বানিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পাত্রের আকার দেওয়া (এই কৌশলটি পূর্ব ভারত ও বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না)। কোন আকারের পাত্র তৈরি করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে কৌশল নির্ধারণ করা হয়। যেমন কলস বা বড় আকারের সঞ্চয়পাত্র তৈরি করার জন্য চাকে তৈরি করা কাঁধার সঙ্গে নিচের অংশ পিটিয়ে জোড়া লাগানো হয় এবং পাত্রের নিম্নাংশ প্রসারিত করা হয়। ছোট আকারের পাত্র অনেক ক্ষেত্রে হাত দিয়ে টিপে ও ছেনে তৈরি করা হয়। অনেক সময়ই মৃৎপাত্রের টুকরোগুলো নিবিড়ভাবে খালি চোখে এবং আতশকাচ বা অনুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে নির্মাণ কৌশলের এই পর্যায়গুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আবার মৃৎপাত্রের বাইরের দিকের পৃষ্ঠতল মসৃণ করার জন্য চাকায় ঘোরানোর সময় কোনো পাথর বা মসৃণ বস্তুর গাত্রে ছুঁইয়ে রাখা হয়। এই চিহ্নও মৃৎপাত্রের ওপর শনাক্ত করা যায়।
আকার দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কখনও কখনও পরের ধাপ হলো নকশা করা/অলঙ্করণ করা। অলঙ্করণ বা নকশা করারও নানান পদ্ধতি আছে। একটি কৌশল হলো খোদাই করা। চাকায় ঘোরানোর সময়ই তুলনামূলকভাবে তীক্ষ্ণ বাঁশের চুলি বা ধাতব বস্তু দিয়ে খোদাই করে দাগ কাটা হয় মৃৎপাত্রের গলা ও শরীরের সংযোগস্থলে বা কাঁধার প্রসারিত অংশে। আকার দেওয়ার পরেও একই ধরনের বস্তু দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নকশা বা অলঙ্করণ করা হয়। অন্য এক ধরনের অলঙ্করণের তরিকা হলো ছাপ দেওয়া। কাঠ/পোড়া মাটি বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে ছাপ দেওয়া হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক মৃৎপাত্রে নানান ধরনের ছাপ পাওয়া যায়। একটাকে যেমন বলা হয় পাটি-ছাপ/ম্যাট ইমপ্রেশন। এই ধরনের ছাপ কেবল যে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দেওয়া হতো তা কিন্তু না। যেমন: খ্রি. ৮ম-৯ম শতকের দিকে আমরা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে রান্না করার হাঁড়ির নিচে এ ধরনের ছাপ দেখতে পাই। এই ছাপ সম্ভবত চুলায় বসানোর আগে মাটির প্রলেপ লাগানোর সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হতো। ওই একই সময়ে আমরা এক ধরনের বাটি পাই। বৌদ্ধ বিহারগুলো থেকে এই বাটিগুলো প্রচুর সংখ্যায় পাওয়া যায়। এই বাটির মধ্যে চাকায় তৈরি করার সময় হাত দিয়ে বানানো চক্রাকার দাগ পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাটির কানা তীক্ষ্ণ করে তোলা হয়েছে। আদি ঐতিহাসিক যুগে (খ্রি.পূর্ব ৬ষ্ঠ – খ্রি. ৩য় শতক) আরেক ধরনের মৃৎপাত্র পাওয়া যায় ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। পাত্রের ভিতরের দিকের পৃষ্ঠে বৃত্তাকারে বড় থেকে ছোট একের পর এক দাগ কাটা থাকে বলে এই পাত্রকে বলা হয় রুলেটেড ওয়্যার। এক সময় মনে করা হতো যে, এই পাত্রগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা। তবে পরবর্তীকালের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মহাস্থানগড়-এর মতো বসতিগুলোতে স্থানীয়ভাবেই এই মৃৎপাত্র তৈরি হয়েছিল। বিস্তৃত একটা অঞ্চলে একই ধরনের নকশার মৃৎপাত্র পাওয়া যাওয়ায় অনুমান করা হয় যে, নকশা করার ধরনটি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। পাত্রের গায়ে আলাদা করে মাটি লাগিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন নকশাও পাওয়া যায়।
নকশা করার পরে মৃৎপাত্রগুলোকে সাধারণত খোলা জায়গায় বাতাসে রেখে শুকানো হয়। কোন ধরনের কাদা ও টেম্পার ব্যবহার করা হয়েছে আর কতটা জল মাটির মধ্যে আছে, তার ওপর শুকানোর ব্যাপ্তি নির্ভর করে। শুকানোর পরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃৎপাত্রের বাইরের পৃষ্ঠে আর যেসব মৃৎপাত্র ভিতরের দিকের পৃষ্ঠ খাওয়ার বা কোনো কিছু রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ভিতরের দিকের পৃষ্ঠে প্রলেপ দেওয়া হয়। কোন রঙের প্রলেপ হবে, তার ওপর নির্ভর করে প্রলেপ তৈরি করা হয়। যেমন: বগুড়া ও দিনাজপুরে বর্তমানে মৃৎশিল্পীগণ জলের সঙ্গে খয়ের ও লাল রঙ মিশিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে প্রলেপ তৈরি করেন। একটি কাপড় দিয়ে সেই প্রলেপ মৃৎপাত্রের ওপর লাগিয়ে পাত্রটিকে পুনরায় শুকানো হয়। খ্রি. ১৩শ-১৪শ শতকে আমরা এই অঞ্চলে এক ধরনের মৃৎপাত্র পাই, যেগুলো চকচকে সবুজাভ নীল, নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙের আস্তরবিশিষ্ট। এই আস্তরটিও প্রলেপ আকারেই পোড়ানোর আগে মৃৎপাত্রের বহির্গাত্রে দেওয়া হতো। এই ধরনের মৃৎপাত্রকে প্রত্নতত্ত্বের মৃৎপাত্রবিজ্ঞানের/সিরামোলজির ভাষায় বলে গ্লেজড ওয়্যার। তখন সম্ভবত একধরনের জৈব-রাসায়নিক দ্রবণ তৈরি করে পোড়ানোর আগে প্রলেপ আকারে দেওয়া হতো। প্রলেপ দিয়ে বিভিন্ন অলঙ্করণও করা হতো।
এর পরে মৃৎপাত্র পোড়ানো হয়। বিভিন্ন এলাকায় মৃৎপাত্র পোড়ানোর চুল্লির প্রকার আলাদা। বাংলাদেশে চুল্লিগুলোকে সাধারণত পইন বলে। পইনের ওপর মৃৎপাত্রগুলো সাজিয়ে উপরে খড়ের একটা আস্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। খড়ের স্তরের ওপরে থাকে মাটির একটি স্তর। তারপরে পইনের নিচ থেকে আগুন জ্বালিয়ে পোড়ানো হয়। মৃৎপাত্রের মূল রঙ কী হবে, তা নির্ভর করে পোড়ানোর কৌশলের ওপর। লাল বা লালচে রঙের মৃৎপাত্র তৈরি করতে হলে মাটির ও খড়ের আস্তরের ওপরে ফুটো করে দেওয়া হয়, ধোঁয়া বের করে দেওয়ার জন্য। এই কৌশলকে বলা হয় জারিত পরিবেশে পোড়ানো। ধূসর বা কালো করার জন্য ওই ফুটোগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই কৌশলকে বলে বিজারিত পরিবেশে পোড়ানো। পোড়ানোর সময়কালও রং ও মৃৎপাত্রের ভঙ্গুরতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তাপের নিয়ন্ত্রণও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাতলা, মসৃণ ও সূক্ষ্ম প্রকারের মৃৎপাত্র তৈরি করার জন্য প্রদেয় তাপ অমসৃণ, খসখসে ও মোটা প্রকারের মৃৎপাত্রের তুলনায় আলাদা হবে।
প্রয়োজন অনুসারে ও কোন কাজে ব্যবহার করা হবে তার ওপর নির্ভর করে পোড়ানোর পরে রঙ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের চিত্র আঁকা হয়, পুরো পাত্রেও রঙ করা হতে পারে। তবে পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ থেকে আমরা রঙ করা পাত্র খুবই কম পাই। উত্তর ও পশ্চিম ভারতে খ্রি.পূর্ব ১২শ-৫ম শতকের সময়ে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। হরপ্পা সভ্যতা-এর বিভিন্ন প্রত্নস্থানেও চিত্রিত বিভিন্ন মৃৎপাত্র পাওয়া যায়।
উপরে সংক্ষেপে মৃৎপাত্র তৈরির বিভিন্ন পর্যায়গুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন মৃৎপাত্র যে শিল্পীরা তৈরি করেছিলেন, তারা তো আর বেঁচে নেই। মৃৎপাত্র তৈরির কৌশলগুলো সম্পর্কে ধারণা করার জন্য তাই বর্তমানে যারা বিভিন্ন পুরোনো ধরনের কৌশল ব্যবহার করে মৃৎপাত্র তৈরি করেন, তাদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ধরনের পর্যবেক্ষণনির্ভর গবেষণাকে বলা হয় জাতিপ্রত্নতত্ত্ব/এথনোআর্কিওলজি। মৃৎপাত্র কেমন হবে, সেটা এই কৌশলগুলোর পাশাপাশি মাটির প্রকৃতির ওপরেও নির্ভর করে। যেমন বর্তমান দিনাজপুরের উত্তরাংশে, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে মৃৎপাত্রের গায়ে সাদা ও কালো রঙের চকচকে কণা দেখতে পাওয়া যাবে। এই কণাগুলো সাধারণত বালিতে বেশি থাকে এবং এদের বলে মাইকা। ওই অঞ্চলে কাদামাটির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম বলে বেলে মাটির অংশটিই মৃৎপাত্র তৈরি করার মণ্ডে বেশি থাকে। অনেক সময় খালি চোখে বা আতশকাচ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেও একটা এলাকার মৃৎপাত্রে ব্যবহৃত মাটির সঙ্গে অন্য এলাকার মাটির ভিন্নতা শনাক্ত করা যায়। তবে সেটা বুঝতে গেলে ওই অঞ্চলগুলোতে কোন কোন ধরনের মাটি সহজলভ্য আর কোন কোন ধরনের মাটি দুর্লভ, সে সম্পর্কে বিশদ ধারণা থাকতে হবে।
মৃৎপাত্র একটা সময় বেশিরভাগ মানুষ ব্যবহার করতেন বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কাজে, বিশেষ বিশেষ কোনো উপলক্ষ উদ্যাপনের জন্যও। বর্তমানের ও প্রত্নতাত্ত্বিক মৃৎপাত্রের ওপর গবেষণা ও পড়াশোনা একই সঙ্গে চালিয়ে যেতে হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে পাওয়া অনেক আকার ও প্রকারের মৃৎপাত্র এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মৃৎপাত্র বাংলাদেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের একটি। কারণ মৃৎপাত্র ও মৃৎপাত্রের টুকরো সাধারণের জীবনযাপন সম্পর্কে, তাদের খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, উৎপাদন পদ্ধতি আর বাণিজ্য সম্পর্কে এবং সেই সব বিষয়ের কালানুক্রমিক পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের বিশদ ও নিবিড় ধারণা দিতে পারে।
মৃৎপাত্রের এই অসামান্য বৈশিষ্ট্য থাকার পরেও, আমরা আপাতদৃষ্টিতে সুন্দর বা মূল্যবান বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এতে করে উচ্চবর্গের মানুষের, রাজা, মহারাজা, সামন্তপ্রভু বা সম্রাটের, অভিজাত মানুষজনের জীবন আমাদের বোঝাপড়ার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নিম্নবর্গের মানুষের জীবনও আমরা বুঝতে চেষ্টা করি উচ্চবর্গের জীবনের প্রতিসরিত অবয়বের মধ্য দিয়ে। এই বোঝাপড়া তাই খণ্ডিত। সাধারণের জীবন সম্পর্কে বুঝতে ও জানতে গেলে তাই আমাদের অভিপ্রায় আর মূল্যবান ও বিখ্যাত কিছু আবিষ্কারের বাসনা পাল্টাতে হবে। মৃৎপাত্রকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে হবে। সেই অভিপ্রায়েই শেষ করছি।
স্বাধীন সেন,
শিক্ষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।


